স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহঃ
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিক সামনে অবস্থিত 'সামউদ্দীন মেমোরিয়াল (প্রাঃ) হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক কমপ্লেক্স' এখন সাধারণ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার এক ত্রাসের নাম। চিকিৎসাসেবার নামে ক্লিনিকটিতে চলছে রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এক মর্মান্তিক বাণিজ্য। গত ১০ দিনের ব্যবধানে ভুল অপারেশনে এক প্রসূতির মৃত্যু এবং অপর এক তরুণীর জরায়ু কেটে বাদ দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র জনরোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
৩ জুলাই: অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ২৩ বছরেই জরায়ু হারাতে হলো ইয়াফাকে
কোটচাঁদপুরের এলাঙ্গী ইউনিয়নের মোঃ তৌহিদুর রহমানের স্ত্রী মোছাঃ ইয়াফা খাতুন (২৩)-কে গত ৩ জুলাই সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য এই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যা ৭টায় অপারেশন থিয়েটারে অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আসলাম হোসেন সিজার করে সন্তান প্রসব করানোর পরপরই তড়িঘড়ি করে ক্লিনিক ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে পেটের ভেতরের রক্ত ও তরল সঠিকভাবে পরিষ্কার না করেই সেলাইয়ের কাজ শেষ করেন ক্লিনিকের মালিক ও অপচিকিৎসার মূল হোতা ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন।
গত ৬ জুলাই ইয়াফাকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও ১৮ জুলাই থেকে তাঁর পেটে তীব্র যন্ত্রণা, ইনফেকশন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ১৯ জুলাই ভোররাতে মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে পুনরায় ক্লিনিকে আনা হলে, রক্তক্ষরণ বন্ধ করার নামে ডাঃ ছহি উদ্দিন জরায়ুর ভেতরে গাদা গাদা গজ ও প্যাড প্রবেশ করান। এতে সিজারের সেলাই ফেটে গিয়ে রোগীর পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে।
অবস্থা বেগতিক দেখে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ইয়াফাকে খুলনার নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অধ্যাপক ডাঃ আসলাম হোসেনের ফুপাতো বোন ডাঃ ডালিয়া আক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষার পর ডাঃ ডালিয়া গা-ঢাকা দিয়ে রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে 'রাশিদা ক্লিনিক' রোগী গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে, খুলনা মেডিকেলের গাইনী বিভাগের অধ্যাপক শিল্পী খাতুন নিজের অ্যাম্বুলেন্সে করে ইয়াফাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
সেখানে ২৬-২৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যৌথ মেডিকেল বোর্ড জরুরি অস্ত্রোপচার চালিয়ে ইয়াফার জীবন রক্ষা করলেও ভুল চিকিৎসার চরম খেসারত হিসেবে মাত্র ২৩ বছর বয়সে চিরতরে কাটা পড়ে তাঁর জরায়ু। খুলনা মেডিকেলের ছাড়পত্র ও মেডিকেল সার্টিফিকেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—পূর্বের সিজারের স্থানে সংক্রামিত রক্ত জমে থাকা, সেলাই ফেটে যাওয়া এবং তীব্র ইনফেকশনের কারণেই জীবন রক্ষার্থে জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে।
১০ জুলাই: অপরিপক্ব অপারেশন ও দায়িত্বে অবহেলায় প্রাণ গেল পপি বেগমের
ইয়াফার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গত ১০ জুলাই একই ক্লিনিকে ঘটে আরেকটি লোমহর্ষক মৃত্যুর ঘটনা। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার আন্দোলবাড়ীয়া গ্রামের আজিবর রহমানের স্ত্রী পপি বেগম (৩৫)-কে সিজারের জন্য ভর্তি করা হয়। ডাঃ ছহি উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই অপারেশনে প্রসূতির 'প্লাসেন্টা প্রিভিয়া' সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে, কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি বা বিশেষজ্ঞ সতর্কতা ছাড়াই জরায়ুর নাড়ী কেটে ফেলেন তিনি।
প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হলে রোগীকে ৫ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। রাত পৌনে ৮টার দিকে অপারেশন শেষ করে অবস্থা চরম সংকটাপন্ন দেখে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে রোগীকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে। পরবর্তীতে ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পপি বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অপকর্ম ও আইনি দায় এড়াতে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মৃত প্রসূতির স্বজনদের কোনো ফোন নম্বরও খাতায় নথিভুক্ত রাখেনি। মর্মান্তিক এই মৃত্যুর বিষয়টি পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকায় গোপনে ধামাচাপা দিয়ে রফাদফা করেছেন অভিযুক্ত ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন।
স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ ও বিচারের দাবি
ভুক্তভোগী ইয়াফা খাতুন ও তাঁর স্বামী তৌহিদুর রহমান সংবাদমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"সামউদ্দীন মেমোরিয়াল হাসপাতাল চিকিৎসার নামে একটি কসাইখানা খুলে বসেছে! ডাঃ আসলাম আর ডাঃ ছহি উদ্দিন টাকার লোভে আমার স্ত্রীর পেটে ময়লা-রক্ত রেখে সেলাই করে দিয়েছে। পরবর্তীতে রক্তপাত বন্ধ করতে যে কায়দায় ভেতরে গজ-প্যাড ঢুকিয়েছে, তা কোনো মানুষ করতে পারে না! আজ আমার স্ত্রীর বয়স মাত্র ২৩, অথচ ভুল চিকিৎসার কারণে সারাজীবনের জন্য তাঁর জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হলো। আমরা এই অপরাধী ডাক্তারদের ফাঁসি এবং এই কসাইখানার নামচিহ্ন মুছে ফেলার দাবি জানাচ্ছি।"
তৌহিদুর রহমান আরও জানান, তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ১২ ব্যাগ রক্ত ও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন বা অধ্যাপক ডাঃ আসলাম হোসেন কোনো খোঁজখবর নেননি। তিনি এই ডাক্তার নামক কসাইদের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে মামলা করার দৃঢ় ঘোষণা দেন।
অভিযুক্ত ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্য
এ বিষয়ে অভিযুক্ত অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আসলাম হোসেন-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, "অপারেশন নিয়ম মেনেই করা হয়েছিল। ঘটনার বিষয় আমরা সব জানি, আপনি প্রতিদিনের কন্ঠের সাংবাদিক সাক্ষাতে এসে কথা বলেন, আমি ঢাকাতে আছি" বলেই ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে, সামউদ্দীন মেমোরিয়াল হাসপাতালের মালিক ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন-এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ কামরুজ্জামান এবং ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন বলেন:
"সামউদ্দীন মেমোরিয়াল ক্লিনিকের এসব অনিয়ম ও প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভুল অস্ত্রোপচার এবং রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রমাণ মিললে কোনো প্রভাবশালীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ক্লিনিকের কার্যক্রম স্থগিতসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
কোটচাঁদপুর ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ সোহেল রানা জানান, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তবে খোঁজখবর নিয়ে সার্বিক বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
একের পর এক প্রসূতি মায়ের জীবন বিপন্ন করা এবং চিকিৎসায় চরম অবহেলার মাধ্যমে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে কোটচাঁদপুরের সচেতন মহল ও সুশীল সমাজ। অবিলম্বে সামউদ্দীন মেমোরিয়াল (প্রাঃ) হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক কমপ্লেক্স সিলগালা করে বন্ধ ঘোষণা এবং অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহঃ
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিক সামনে অবস্থিত 'সামউদ্দীন মেমোরিয়াল (প্রাঃ) হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক কমপ্লেক্স' এখন সাধারণ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার এক ত্রাসের নাম। চিকিৎসাসেবার নামে ক্লিনিকটিতে চলছে রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এক মর্মান্তিক বাণিজ্য। গত ১০ দিনের ব্যবধানে ভুল অপারেশনে এক প্রসূতির মৃত্যু এবং অপর এক তরুণীর জরায়ু কেটে বাদ দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র জনরোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
৩ জুলাই: অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ২৩ বছরেই জরায়ু হারাতে হলো ইয়াফাকে
কোটচাঁদপুরের এলাঙ্গী ইউনিয়নের মোঃ তৌহিদুর রহমানের স্ত্রী মোছাঃ ইয়াফা খাতুন (২৩)-কে গত ৩ জুলাই সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য এই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যা ৭টায় অপারেশন থিয়েটারে অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আসলাম হোসেন সিজার করে সন্তান প্রসব করানোর পরপরই তড়িঘড়ি করে ক্লিনিক ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে পেটের ভেতরের রক্ত ও তরল সঠিকভাবে পরিষ্কার না করেই সেলাইয়ের কাজ শেষ করেন ক্লিনিকের মালিক ও অপচিকিৎসার মূল হোতা ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন।
গত ৬ জুলাই ইয়াফাকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও ১৮ জুলাই থেকে তাঁর পেটে তীব্র যন্ত্রণা, ইনফেকশন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ১৯ জুলাই ভোররাতে মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে পুনরায় ক্লিনিকে আনা হলে, রক্তক্ষরণ বন্ধ করার নামে ডাঃ ছহি উদ্দিন জরায়ুর ভেতরে গাদা গাদা গজ ও প্যাড প্রবেশ করান। এতে সিজারের সেলাই ফেটে গিয়ে রোগীর পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে।
অবস্থা বেগতিক দেখে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ইয়াফাকে খুলনার নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অধ্যাপক ডাঃ আসলাম হোসেনের ফুপাতো বোন ডাঃ ডালিয়া আক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষার পর ডাঃ ডালিয়া গা-ঢাকা দিয়ে রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে 'রাশিদা ক্লিনিক' রোগী গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে, খুলনা মেডিকেলের গাইনী বিভাগের অধ্যাপক শিল্পী খাতুন নিজের অ্যাম্বুলেন্সে করে ইয়াফাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
সেখানে ২৬-২৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যৌথ মেডিকেল বোর্ড জরুরি অস্ত্রোপচার চালিয়ে ইয়াফার জীবন রক্ষা করলেও ভুল চিকিৎসার চরম খেসারত হিসেবে মাত্র ২৩ বছর বয়সে চিরতরে কাটা পড়ে তাঁর জরায়ু। খুলনা মেডিকেলের ছাড়পত্র ও মেডিকেল সার্টিফিকেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—পূর্বের সিজারের স্থানে সংক্রামিত রক্ত জমে থাকা, সেলাই ফেটে যাওয়া এবং তীব্র ইনফেকশনের কারণেই জীবন রক্ষার্থে জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে।
১০ জুলাই: অপরিপক্ব অপারেশন ও দায়িত্বে অবহেলায় প্রাণ গেল পপি বেগমের
ইয়াফার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গত ১০ জুলাই একই ক্লিনিকে ঘটে আরেকটি লোমহর্ষক মৃত্যুর ঘটনা। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার আন্দোলবাড়ীয়া গ্রামের আজিবর রহমানের স্ত্রী পপি বেগম (৩৫)-কে সিজারের জন্য ভর্তি করা হয়। ডাঃ ছহি উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই অপারেশনে প্রসূতির 'প্লাসেন্টা প্রিভিয়া' সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে, কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি বা বিশেষজ্ঞ সতর্কতা ছাড়াই জরায়ুর নাড়ী কেটে ফেলেন তিনি।
প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হলে রোগীকে ৫ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। রাত পৌনে ৮টার দিকে অপারেশন শেষ করে অবস্থা চরম সংকটাপন্ন দেখে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে রোগীকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে। পরবর্তীতে ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পপি বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অপকর্ম ও আইনি দায় এড়াতে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মৃত প্রসূতির স্বজনদের কোনো ফোন নম্বরও খাতায় নথিভুক্ত রাখেনি। মর্মান্তিক এই মৃত্যুর বিষয়টি পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকায় গোপনে ধামাচাপা দিয়ে রফাদফা করেছেন অভিযুক্ত ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন।
স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ ও বিচারের দাবি
ভুক্তভোগী ইয়াফা খাতুন ও তাঁর স্বামী তৌহিদুর রহমান সংবাদমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"সামউদ্দীন মেমোরিয়াল হাসপাতাল চিকিৎসার নামে একটি কসাইখানা খুলে বসেছে! ডাঃ আসলাম আর ডাঃ ছহি উদ্দিন টাকার লোভে আমার স্ত্রীর পেটে ময়লা-রক্ত রেখে সেলাই করে দিয়েছে। পরবর্তীতে রক্তপাত বন্ধ করতে যে কায়দায় ভেতরে গজ-প্যাড ঢুকিয়েছে, তা কোনো মানুষ করতে পারে না! আজ আমার স্ত্রীর বয়স মাত্র ২৩, অথচ ভুল চিকিৎসার কারণে সারাজীবনের জন্য তাঁর জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হলো। আমরা এই অপরাধী ডাক্তারদের ফাঁসি এবং এই কসাইখানার নামচিহ্ন মুছে ফেলার দাবি জানাচ্ছি।"
তৌহিদুর রহমান আরও জানান, তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ১২ ব্যাগ রক্ত ও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন বা অধ্যাপক ডাঃ আসলাম হোসেন কোনো খোঁজখবর নেননি। তিনি এই ডাক্তার নামক কসাইদের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে মামলা করার দৃঢ় ঘোষণা দেন।
অভিযুক্ত ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্য
এ বিষয়ে অভিযুক্ত অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আসলাম হোসেন-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, "অপারেশন নিয়ম মেনেই করা হয়েছিল। ঘটনার বিষয় আমরা সব জানি, আপনি প্রতিদিনের কন্ঠের সাংবাদিক সাক্ষাতে এসে কথা বলেন, আমি ঢাকাতে আছি" বলেই ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে, সামউদ্দীন মেমোরিয়াল হাসপাতালের মালিক ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন-এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ কামরুজ্জামান এবং ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন বলেন:
"সামউদ্দীন মেমোরিয়াল ক্লিনিকের এসব অনিয়ম ও প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভুল অস্ত্রোপচার এবং রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রমাণ মিললে কোনো প্রভাবশালীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ক্লিনিকের কার্যক্রম স্থগিতসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
কোটচাঁদপুর ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ সোহেল রানা জানান, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তবে খোঁজখবর নিয়ে সার্বিক বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
একের পর এক প্রসূতি মায়ের জীবন বিপন্ন করা এবং চিকিৎসায় চরম অবহেলার মাধ্যমে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে কোটচাঁদপুরের সচেতন মহল ও সুশীল সমাজ। অবিলম্বে সামউদ্দীন মেমোরিয়াল (প্রাঃ) হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক কমপ্লেক্স সিলগালা করে বন্ধ ঘোষণা এবং অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
